দিল্লি ভ্রমণ-

দিল্লি (Delhi) ইতিহাসের হাজার ঐতিহ্য নিয়ে সেই সময়ের দিল্লি থেকে এখন নয়াদিল্লি। তাই ভ্রমণ পিপাসুদের আগ্রহের স্থান এটি। হাজার ঐতিহ্যের দিল্লি ভ্রমণ পিপাসুদের আগ্রহের কেন্দ্র বিন্দুতে। হিন্দু রাজপুত শাসক থেকে শুরু করে মুঘল আমল, এরপর ব্রিটিশ শাসন। সব মিলিয়ে সাতটি শহরের উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে আজকের আধুনিক শহর দিল্লি। এ শহরেই আপনি একসঙ্গে পেয়ে যাবেন হাজার বছরের ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে থাকা স্মৃতিস্তম্ভ কুতুব মীনার, আধুনিকতার বাহন মেট্রোরেল, মোঘলদের ঐতিহ্য ধারণ করা বাজার থেকে মেগামল, আদী প্রার্থণাকেন্দ্র, জামা মসজিদ থেকে শুরু করে আধুনিকতার কোমল স্পর্শে নির্মিত লোটাস টেম্পল। আছে হুমায়ুন সমাধিসৌধ, লাল কেল্লা, পুরনো কেল্লা। ঘুরে দেখতে পারেন রাষ্ট্রপতি ভবন এবং ইন্ডিয়া গেট।

ভারতের রাজধানী দিল্লি, প্রাচীন অতীতকে উজ্জ্বলভাবে উচ্চারিত করে, একই সময়ে সময়ে ভারতের আধুনিক ভবিষ্যৎকে তুলে ধরেন। এটি দুটি ভাগে বিভক্ত – পুরাতন দিল্লির ভাঙা পুরাতন শহর এবং সুশৃঙ্খল ও সুপ্রতিষ্ঠিত নতুন দিল্লি – পাশাপাশি বিদ্যমান ঐতিহ্য-আধুনিকতার দিল্লি।

দিল্লি ভ্রমণের দর্শনীয় স্থানসমূহ                           

লালকেল্লা

পর্যটকদের আকর্ষণীয় আরও অনেক জায়গা থাকা সত্ত্বেও, লাল কেল্লা নিঃসন্দেহে দিল্লিতে দেখার জন্য স্থানগুলির তালিকার শীর্ষে রয়েছে। এটি একটি শক্তিশালী কাঠামো যা এক সময় ভারতের মুঘল সাম্রাজ্যের আসন ছিল। এটিতে অনেক প্রাসাদ এবং উদ্যান রয়েছে যা ১৬৩৯ সালে মুঘল রাজা শাহজাহান তৈরি করেছিলেন। পুরো দুর্গটি লাল পাথর এবং অন্যান্য মার্বেল দ্বারা গঠিত। প্রাসাদ কাঠামোটি রেলওয়ে স্টেশনগুলির খুব কাছাকাছি এবং বেশিরভাগ পর্যটক এই পুরানো ঐতিহাসিক কাঠামো নিয়ে শহরের যাত্রা শুরু করেন।

দিওয়ানআম

দিল্লি গেটের বাইরে একটি বড়ো মুক্তাঙ্গন রয়েছে। এটি এককালে দিওয়ান-ই-আম-এর অঙ্গন রূপে ব্যবহৃত হত। এখানে ঝরোখা নামে একটি অলংকৃত সিংহাসনে বসে সম্রাট জনসাধারণকে দর্শন দিতেন। এই স্তম্ভগুলি সোনায় চিত্রিত ছিল এবং সোনা ও রুপোর রেলিং দিয়ে সাধারণকে সিংহাসনের থেকে পৃথক করে রাখা হত।

দিওয়ান-ই-খাস

দিওয়ান-ই-খাস ছিল পুরোপুরি শ্বেতপাথরে মোড়া একটি কক্ষ। এর স্তম্ভগুলি পুষ্পচিত্রে সজ্জিত ছিল। ভিতরের অলংকরণের কাজে ব্যবহৃত হয়েছিল প্রায়-মহামূল্যবান ধাতুসমূহ।

নহরবেহিস্ত

সিংহাসনের পশ্চাতে ছিল সম্রাট পরিবারের নিজস্ব কক্ষগুলি। এই কক্ষগুলি দুর্গের পূর্ব প্রান্ত ঘেঁষা দুটি কক্ষের সারির উপর অবস্থিত ছিল। এই সারি দুটি উচ্চ বেদীর উপর অবস্থিত ছিল এবং কক্ষগুলি থেকে যমুনা নদীর দৃশ্য দেখা যেত। কক্ষগুলি নহর-ই-বেহিস্ত (স্বর্গোদ্যানের জলধারা) নামে একটি নীরবিচ্ছিন্ন জলধারা দ্বারা পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত ছিল। এই জলধারা প্রত্যেক কক্ষের মাঝ বরাবর প্রসারিত ছিল। যমুনা নদী থেকে দুর্গের উত্তর-পূর্ব কোণে অবস্থিত শাহ বুর্জ নামে একটি মিনারে জল টেনে তুলে এই জলধারাকে পুষ্ট করা হত। প্রাসাদটি নির্মিত হয়েছিল কুরআনে বর্ণিত স্বর্গোদ্যানের অনুকরণে। প্রাসাদের ভিতরের গাত্রে “যদি পৃথিবীতে কোথাও স্বর্গ থাকে তবে তা এখানেই, তা এখানেই, তা এখানেই” কথাটি উপর্যুপরি দেওয়ালে খোদিত হয়েছিল। ইসলামি শিল্পকলা অনুযায়ী নির্মিত হলেও এই সব কক্ষে হিন্দু শিল্পকলার প্রভাবও খুঁজে পাওয়া যায়। প্রাসাদ প্রাঙ্গনটিকে মুঘল স্থাপত্যশৈলীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ নিদর্শন বলে মনে করা হয়।

কুতুব মিনার

দিল্লীতে অবস্থিত কুতুব মিনার বিশ্বের সবচেয়ে লম্বা ইঁটের তৈরী মিনার। এটি ৭২.৫ মিটার উচ্চতা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ১১৯৩ সালে, দিল্লীর প্রথম মুসলিম শাসক কুতুব-উদ-দীন-আঈবক-এর অনুমতিতে এটি স্থাপিত হয়, তবে সেইসময় এটির কেবলমাত্র একটি ভিত ছিল। পরবর্তীকালে তার উত্তরাধিকারী ও জামাতা শামসু’দ-দীন ইলতূৎমিশ এই গঠনের উপর আরোও তিনটি স্তম্ভ সংযুক্ত করেন। কুতুব মিনার ইন্দো-ইসলামিক স্থাপত্যের প্রাচীনতম ও সবচেয়ে স্পষ্ট উদাহরণ হিসাবে পরিচিত। এটি আরোও বেশ কিছু অন্যান্য প্রাচীন কাঠামো দিয়ে বেষ্টিত রয়েছে, যা সামগ্রীকভাবে কুতুব কমপ্লেক্স নামে পরিচিত।

জামে মসজিদ

পুরনো দিল্লীতে অবস্থিত জামা মসজিদ হল দিল্লীর এক অন্যতম প্রধান মসজিদ। সম্রাট শাহজাহানের এক অন্যতম চূড়ান্ত স্থাপত্যকলার অত্যাধিক্যের ফলস্বরূপ এটি ভারতের এক অন্যতম বৃহৎ মসজিদ এবং এর প্রাঙ্গনে একসঙ্গে প্রায় ২৫০০০ মানুষের জমায়েতের সুবন্দোবস্ত রয়েছে। এই মসজিদটির নির্মাণ কার্য ১৬৪৪ সালে আরম্ভ হয়েছিল এবং ৫০০০ কারিগরের দ্বারা এটি ১৬৫৮ সালে সম্পূর্ণ হয়। জামা মসজিদের তিনটি মহান প্রবেশদ্বার রয়েছে এবং চারটি কোণাকার স্তম্ভ ও ৪০ মিটার উচ্চতাসম্পন্ন দুটি মিনার রয়েছে। এটি পর্যায়ক্রমিকভাবে লাল বালিপাথর ও সাদা মার্বেলের দ্বারা নির্মাণ করা হয়েছিল।

সম্রাট হুমায়ুনের সমাধি

১৫৭০ সালে নির্মিত হুমায়ুনের সমাধি দিল্লীর ইউনেস্কো ঘোষিত আরেকটি ওয়ার্ড হেরিটেজ সাইট। এটি হলো আগ্রার তাজমহলের mother structure. এর কারণ এটি তৈরীর পরপরই এর অনুকরণে পরবর্তীতে আরো বৃহৎ আকারে ও নকশায় আরো পরিবর্তন এনে আগ্রার তাজমহল তৈরী করা হয়। এখানে সমাহিত আছেন, মুঘল সাম্রাজ্যের ২য় সম্রাট হুমায়ুন। নান্দনিক সৌন্দর্য আর কারুকার্যে ভরা এ কমপ্লেক্সটি ঘুরে দেখতে সময় লাগবে ১-২ ঘন্টা। এখানে একটি চোরা বুদ্ধি আমরা খাটিয়েছিলাম, একই কাজ আগ্রার তাজমহল দেখার সময়ও করেছিলাম। ভারত ছাড়া অন্য সব দেশের নাগরিকদের জন্য টিকেট প্রায় ৫০০ রুপি করে আর ভারতের নাগরিকদের জন্য ৫০ রুপি।

পদ্ম মন্দির

এটি পদ্মের মতো আকৃতির একটি খুব বিখ্যাত বাহাই মন্দির। পর্যটকরা রাতে এই সুন্দর কাঠামোটি দেখার জন্য সারিবদ্ধ হন যখন এটি সুন্দরভাবে আলোকিত হয়। এই মন্দিরটি সাদা মার্বেল দিয়ে তৈরি। মন্দিরটি চারপাশে অনেক উদ্যান এবং পুকুর দ্বারা পরিবেষ্টিত যেখানে পর্যটকরা আরাম করে এবং উপভোগ করে।

অক্ষরধাম মন্দির

নয়াদিল্লির অক্ষরধাম মন্দিরটি একটি বিশাল কাঠামো যা হিন্দু সংস্কৃতি এবং ধর্মকে মূর্ত করে। এটি দীর্ঘদেহী স্থাপত্য সহ একটি সুন্দর মন্দির যা প্রাচীন ভারতীয় traditionsতিহ্য এবং ধর্মীয় এবং আধ্যাত্মিক বার্তাগুলিকে মূর্ত করে।

যন্তর মন্ত্র

এটি ১25২৫ সালে রাজা জয় সিংহের তৈরি একটি প্রাচীন পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র। এটি একটি সূর্যালোক রয়েছে যা সূর্যের চারদিকে পৃথিবীর চলাচলের ভিত্তিতে দিনের সঠিক সময়টি বলে দেয়।

ইস্কন মন্দির

এই বিশাল মন্দিরটি হরে কৃষ্ণ মন্দির নামেও পরিচিত কারণ এতে শ্রীকৃষ্ণের অনেক সুন্দর প্রতিমা রয়েছে। মন্দিরটি লাল পাথর দ্বারা তৈরি এবং আধুনিক স্থাপত্যের সাথে traditionalতিহ্যবাহী হিন্দু স্থাপত্যকে সুন্দরভাবে মিশ্রিত করেছে।

রাষ্ট্রপতি ভবন

এটি ভারতের রাষ্ট্রপতির সরকারী আবাস যা একসময় ব্রিটিশ ভারতের ভিসেরোয়াদের আবাস হিসাবে ব্যবহৃত হত। এই বিস্তৃত কাঠামোটি বিখ্যাত আর্কিটেক্ট এডউইন লুটিয়েন্স ডিজাইন করেছিলেন এবং ১৯৩০ সালে এটি সম্পন্ন করেছিলেন। ভবনে একটি মুঘল উদ্যান নামে একটি সুন্দর উদ্যান রয়েছে যা বহু দর্শনার্থী দিল্লিতে আসেন is

বিড়লা মন্দির

এটি একটি বিশাল মন্দির যা ভগবান বিষ্ণু এবং দেবী লক্ষ্মীর প্রতি অনুগত। এটি শিল্পপতি জিডি বিড়লা নির্মাণ করেছিলেন এবং মহাত্মা গান্ধী উদ্বোধন করেছিলেন। এই মন্দিরটি ভারতের অন্যতম প্রধান মন্দির।

গান্ধী স্মৃতি

মহাত্মা গান্ধীর শিক্ষায় আগ্রহী সমস্ত পর্যটকদের জন্য গান্ধী স্মৃতি অবশ্যই একটি দেখার জায়গা। তাঁকে বলা হয় জাতির পিতা। আপনি যে হত্যার জন্য নিখরচায় ছিলেন এবং সেই জায়গা যেখানে তিনি হত্যার আগে তিন মাসেরও বেশি সময় ধরে বাস করতে পেরেছিলেন তা আপনি দেখতে পাচ্ছেন। আপনি প্রার্থনার মাঠও দেখতে পাচ্ছেন যেখানে প্রতি সন্ধ্যায় বাপু গণ প্রার্থনা করতেন।

লোটাস টেম্পল

পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তের সাতটি প্রাসাদের সর্বশেষটি হচ্ছে ভারতীয় উপমহাদেশের বাহাই উপাসনালয়, যেটিকে সবাই “লোটাস টেম্পল” নামে জানি। এটি ভারতের দিল্লীতে অবস্থিত। এটির প্রতিটি নকশা স্বতন্ত্র ও বৈচিত্র্যময়।

জাতীয় রেল মিউজিয়াম

ভারতীয় রেলের একাল – সেকালের নানা জিনিস এখানে প্রদর্শিত।

ইন্ডিয়া গেট

এটি নয়াদিল্লির প্রাণকেন্দ্রের একটি বিশাল যুদ্ধের স্মৃতিচিহ্ন যা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর হয়ে লড়াইয়ে মারা যাওয়া সৈন্যদের বীরত্বের স্মরণে নির্মিত হয়েছিল। এটি রাতের আলোয় আলোকসজ্জা দেখায় এবং পর্যটকরা এই কাঠামোর চারপাশের বাগানে সময় কাটায়। ।

কীভাবে যাবেন

বাস,ট্রেন, বিমান অনেকভাবে দিল্লী যাওয়া যায়। সড়ক পথে যেতে ঢাকার কল্যাণপুর থেকে কেটে নিন বাসের টিকেট। কলকাতা পৌঁছে কেটে নিন সবচেয়ে দ্রুতগামী ট্রেন রাজধানী এক্সপ্রেসের টিকিট, যা আপনাকে নামিয়ে দেবে নিউ দিল্লি রেলস্টেশনে। চাইলে অন্যান্য ট্রেনের টিকেটও কাটতে পারেন, যার মধ্যে রয়েছে ইউভা এক্সপ্রেস যেটি আপনাকে নিয়ে যাবে আনন বিহার রেলস্টেশন দিল্লি, কালকা মেল আপনাকে নামিয়ে দিবে পুরাতন দিল্লি রেলস্টেশনে। এ ছাড়া আরো অনেক ট্রেন রয়েছে যা কলকাতা থেকে দিল্লি পর্যন্ত যাতায়াত করে।

খাওয়া দাওয়া

ভোজনরসিক দের জন্য দিল্লি যেনো একটি হ্যাভেনলি ফুড হাব।দিল্লিতে এমন ভিন্ন ভিন্ন স্বাদের খাবার রয়েছে যা বলে বুঝানো মুশকিল। স্ট্রিট ফুড থেকে শুরু করে মুঘলাই ও আন্তর্জাতিক মানের বিভিন্ন কুজিন আছে এখানে।কাবাব গলির ইন্ডিয়ান খাবার, হালদিরামের স্থানীয় দিল্লির সব্জীর আইটেম।কারিম’স এর পুরাতন দিল্লির খাবার, এশিয়াম হাউসের এশিয়ান ফুড।সুশি হাউজের সুশি,দীস বিরিয়ানির বিরিয়ানি ও চাওলা ইন্ডিয়ান কারি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

কোথায় থাকবেন            

দিল্লি যেহেতু ভারতের রাজধানী শহর সেহেতু এখানে নানা ধরনের অসংখ্য হোটেল আছে। দিল্লিতে কম খরচে থাকার জন্য সবচেয়ে ভালো জায়গা পাহাড়গঞ্জ।সেখানে আপনি আপনার বাজেট অনুযায়ী হোটেল পেয়ে যাবেন। 

বি: দ্র : ঘুরতে গিয়ে দয়া করে পরিবেশ নষ্ট করবেন না,চিপস এর প্যাকেট, পানির বোতল এবং অপচনশীল দ্রব্য নির্ধারিত স্হানে ফেলুন।। এই পৃথিবী, আমার, আপনার সুতরাং নিজের দেশ এবং পৃথিবীকে সুন্দর রাখা এবং রক্ষনাবেক্ষনের দায়িত্বও আমার এবং আপনার হ্যাপি_ট্রাভেলিং

ভ্রমণ বিষয়ক তথ্য পেতে জয়েন করুন আমাদের ফেইসবুক গ্রুপ এবং ফলো করুন আমাদের পেইজ