মুন্নার ভ্রমণ-

মুন্নার (Munnar) কেরালার পশ্চিমঘাট পর্বতমালার শৈল শহর হিসেবে পরিচিত মুন্নার এক জনপ্রিয় পর্যটন স্থান। শহরটি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৫২০০ ফুট উচ্চতায় অবস্থিত। পাহাড়ি আঁকাবাঁকা পথ পেরিয়ে শুধু চা বাগানই নয় জলপ্রপাত, নদী, অরণ্য আর নান্দনিক পার্ক- সব মিলে শহরটি অসাধারণ সুন্দর। শান্ত, নির্মল ও নিরালা এই শহরের রাস্তাগুলোও দেখার মতো। মুথিরাপুরা, নল্লাথান্নি ও কুন্ডালা এই তিনটি পার্বত্য নদীর মিলনস্থলে শহরটি গড়ে উঠেছে।

মুন্নার এর দর্শনীয় স্থান

সারি সারি রুপালি অর্জুন এবং সবুজ চা বাগানের সাগরের মাঝে নিরুদ্দেশ হয়ে যেতে চাইলে মুন্নার সবচেয়ে ভালো জায়গা। কেরালা রাজ্যের মাঝে অবস্থিত এটি বিশ্বখ্যাত চায়ের রাজ্য। চারদিকে শুধু সবুজ চা বাগানের সারি। কখনো কখনো মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে রাবারের গাছ। সারা রাস্তা জুড়ে মেঘ রোদ্দুরের লুকোচুরি। ইংরেজ আমলে দক্ষিণ ভারতের ব্রিটিশ সরকারের কর্মকর্তারা তাদের গ্রীষ্মকালীন অবকাশ যাপনের জন্য মুন্নার শহরটিকে নতুন রূপে গড়ে তোলেন।

চা বাগানই মুন্নার-এর একমাত্র ট্যুরিস্ট আকর্ষণ নয়। দর্শনীয় সব জলপ্রপাত, সুউচ্চ পর্বতমালা, শহরের পাশ দিয়ে বয়ে চলা প্রাকৃতিক ও কৃত্রিমভাবে গড়ে উঠা লেকের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য যেকোনো পর্যটকের মনকে মোহিত করবে। এরাভিকুলাম জাতীয় উদ্যান আছে এই টাউনে। সুন্দর গঠন এবং মোটা চামড়ার অধিকারী বিলুপ্তপ্রায় নীলগিরি টাহর মোষের দেখা মিলবে এই সুরক্ষিত জঙ্গলে। নিলাকুরাঞ্জি এক ধরনের অদ্ভুত সুন্দর বেগুনি রঙা ফুল। সেই বিরল ফুল আছে এই উদ্যানে এবং প্রতি ১২ বছর অন্তর এই ফুল ফোটে। সেই সময় পুরো মুন্নার অঞ্চলের পাহাড় ঢেকে যায় বেগুনি চাদরে। সে এক অপূর্ব সুন্দর দৃশ্য, যা দেখার জন্য দূরদূরান্ত থেকে মানুষ ভিড় করে এই অঞ্চলে।

টপ স্টেশন ভিউ পয়েন্ট

স্থানটি মুন্নারের সর্বোচ্চ ভিউ পয়েন্ট। মুন্নার থেকে ৩২ কিলোমিটার দূরে মুন্নার কোদাইকানাল রোডে এই ভিউ পয়েন্ট। চারদিকে উঁচু উঁচু পাহাড়। এখান থেকে কিছুটা পথ হেঁটে, বেশ কিছু সিঁড়ি ভেঙে যেতে হয় ভিউ পয়েন্টে। এখান থেকে নিচের থেনি শহরকে মনে হয় লিলিপুটদের রাজ্য।

কুন্ডালা হ্রদ

যদিও এটি মুন্নার থেকে ২০ কিলোমিটার দূরে রয়েছে, সেখানে থাকার সময় আপনাকে অবশ্যই   এই কৃত্রিম হ্রদটি দেখতে হবে যা কুন্ডালা আর্চ বাঁধ থেকে তার জল পায়। হ্রদটি নিজেই ১৭০০ মিটার উচ্চতায়। পাহাড় এবং পর্বতমালা ঘেরা চারপাশ, এর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য নীল আকাশ এবং চকচকে নীল জলের বিপরীতে সবুজ উপত্যকা। আপনি এখানে নৌকা চালানো এবং ঘোড়সওয়ারের মতো ক্রিয়াকলাপগুলিতে জড়িত থাকতে পারেন এবং চেরি ফুল সহ উদ্যানগুলি ঘুরে দেখতে পারেন যা এখানে বছরে দু’বার প্রস্ফুটিত হয় এবং আপনি যদি ভাগ্যবান হন তবে আপনি দেখতে পাবেন বিখ্যাত নীল নীলাকুড়ুনজি ফুল যা প্রতি বারো বছর পর একবার ফুল হয়।

দেবীকুলম

প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর মুন্নারের আরও একটি জনপ্রিয় দর্শনীয় স্থান দেবীকুলম। দেবীকুলম চা বাগানের জন্য প্রসিদ্ধ। চারদিকে চা বাগান। কোথায় রাস্তা শেষ হয়েছে আর কোথায় চা বাগানের শুরু তার তফাৎ করা যায় না। সবুজের এতো রকম বৈচিত্র্য হতে পারে, নিজের চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা কষ্টকর। কোথাও গাঢ়, কোথাও নীলচে, কোথাও আবার পান্না, মনে হয় কেউ যত্ন করে সবুজ আঁচড় কেটে রেখেছে।

ব্লুজম পার্ক

মুন্নারের পথে পথে পর্যটকদের জন্য অপেক্ষা করে আছে নানা রকমের চমক। এমন এক চমক জাগানিয়া স্থান ব্লুজম পার্ক। প্রায় ১৬ একর জায়গা জুড়ে পার্কটি বিস্তৃত। মুন্নার থেকে ৩ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই উদ্যানে বিভিন্ন প্রজাতির ফুলের গাছ আর অর্কিডের সমারোহ চোখে পড়ার মতো। নানা ফুলের সমারোহে উদ্যানটি সবসময় যেন বর্ণিল হয়ে থাকে। এমন কোনো রঙ নেই যার দেখা ব্লুজম পার্কে পাওয়া যাবে না। পার্কে পর্যটকদের জন্য নৌকা ভ্রমণ, সাইকেল চালানো, রোলার স্কেটিং ইত্যাদির নানা বিনোদনের ব্যবস্থা রয়েছে।

পল্লিভাসল

মুন্নার শুধু পাহাড়ই নয় ছোট-বড় অসংখ্য জলপ্রপাতের জন্যও বিখ্যাত। এমনই এক জলপ্রপাত পল্লিভাসল। এখানেই কেরালার প্রথম জল-বিদ্যুৎ প্রকল্প অবস্থিত। মুন্নার থেকে ২৩ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের কারণে পল্লিভাসল পর্যটকদের পছন্দের এক দ্রষ্টব্য স্থান।

ইকো পয়েন্ট

মুন্নার থেকে ১৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত ইকো পয়েন্ট। এখানকার নিরিবিলি প্রাকৃতিক পরিবেশ যেকোনো পর্যটককে মুগ্ধ করে। লেকে বোটিং করা, বুনো ফুলের মন মাতানো গন্ধ চারপাশের পরিবেশকে মোহময় করে তোলে। ইকো পয়েন্টের কয়েকটি স্থানে বিভিন্ন রকম মশলা থেকে শুরু করে নানা ধরনের জিনিসপত্রের বেচাকেনার হাট বসে। আত্মীয় পরিজনদের উপহার দেওয়ার জন্য অনেকেই এখান থেকে নানা উপহার সামগ্রী কিনে থাকেন।

চিন্নাকনাল এবং আনয়িরঙ্গাল

মুন্নারের কাছেই চিন্নাকনাল এবং তার জলপ্রপাতটি অবস্থিত যা কিনা পাওয়ার হাউজ জলপ্রপাত হিসেবে পরিচিত, সমুদ্র তল থেকে ২০০০মিটার উচ্চতায় একটি খাঁড়া পাথর থেকে এই জলপ্রপাতটি ঝরে পরছে। পশ্চিমঘাট পর্বত মালার অপূর্ব প্রাকৃতিক দৃশ্যরাজিতে সমৃদ্ধ এই স্থান। আপনার যাত্রাপথে চিন্নাকনাল থেকে সাত কিলোমিটার ও মুন্নার থেকে ২২ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত আনয়িরঙ্গল সবুজ চা বাগিচায় ঢাকা। এর জলাধারে একদফা ভ্রমণ এক স্মরণীয় অভিজ্ঞতা। আনরিরঙ্গল ঘিরে রয়েছে সবুজ চা বাগিচা এবং চিরহরিৎ অরণ্য।

টপ স্টেশন

মুন্নার থেকে ৩২ কিলোমিটার দূরে সমুদ্র তল থেকে ১৭০০ মিটার উচ্চতায় টপ স্টেশন অবস্থিত। এটি মুন্নার কোদাইকানাল রোডের সর্বোচ্চ বিন্দু। প্রতিবেশী রাজ্য তামিলনাড়ুর বিস্তৃত সৌন্দর্য উপভোগ করার জন্য মুন্নারে আসা পর্যটকরা একবার অন্তত এখানে আসে। বিস্তৃত অঞ্চল জুড়ে ফুটে থাকা নীলাকুরিঞ্জি ফুল উপভোগ করার জন্য এটি মুন্নারের একটি অন্যতম স্পট।

চা মিউজিয়ম

মুন্নারে সারিবদ্ধ ওক গাছের রূপালি সাজ আর বর্ষণস্নাত চা বাগান যে একবার দেখেছে সে-ই বুঝতে পারবে এর মহিমা। টাটা টি মিউজিয়াম এখানকার সবচেয়ে জনপ্রিয় টি ভ্যালি ট্যুর। পাহাড়ের পর পাহাড়ে কার্পেটের মতো বিছিয়ে রয়েছে চা বাগান। কীভাবে চা তোলা হয়, কীভাবে প্রসেস করা হয় সবকিছুর সাক্ষী হওয়ার জন্য দর্শকরা এই টাটা টি মিউজিয়ামে দেখতে আসেন।

চা আবাদের উৎস ও বিবর্তনের দিক দিয়ে দেখতে গেলে মুন্নারের নিজস্ব উত্তরাধিকার রয়েছে। এই উত্তরাধিকারের কথা মনে রেখে কেরালার উচ্চভূমিতে চা আবাদের সূচনা ও বৃদ্ধির কিছু চমৎকার ও আকর্ষনীয় বিষয় সংরক্ষণ ও প্রদর্শনের জন্য কিছু বছর আগে টাটা টী মুন্নারে একটি মিউজিয়ম তৈরি করেছে। এই মিউজিয়মে হাতে তৈরি চা সংক্রান্ত জিনিসপত্র, মেশিন এবং ফটোগ্রাফ রয়েছে যার প্রত্যেকটির পিছনে মুন্নারে চা বাগিচার উৎস এবং উন্নতির গল্প লুকিয়ে আছে। মুন্নারের নল্লাথান্নি এস্টেটে টাটা টি র এই মিউজিয়মটি অবস্থিত এবং এটি পরিদর্শন যোগ্য।

ইরাভিকুলাম ন্যাশনাল পার্ক

মুন্নার থেকে ১৭ কিলোমিটার দূরে রাজামালাই অঞ্চলে অবস্থিত ইরাভিকুলাম ন্যাশনাল পার্ক। এখান থেকে দেখা যায় দক্ষিণ ভারতের সবচেয়ে উঁচু পাহাড় আনামুদি পিক। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ২৬৯৫ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত এই পিক। অনেকেই এই পাহাড়ে ট্রেকিং করার জন্য আসেন। ইরাভিকুলাম বন এবং বন্যপ্রাণী দপ্তর থেকে অনুমতি নিয়ে এই শৃঙ্গে উঠা যায়।

আনামুদি পিক

আনামুদি শৃঙ্গ ইরাভিকুলম ন্যাশনাল পার্কের ভিতরেই অবস্থিত। এটি দক্ষিণ ভারতের সর্বোচ্চ শৃঙ্গ এবং এর উচ্চতা ২৭০০ মিটার। ইরাভিকুলমে বন এবং বন্যপ্রাণী দপ্তর থেকে অনুমতি এই শৃঙ্গে ওঠা যায়।

আনাইরাঙ্গাল ড্যাম

মুন্নারের আরও একটি জনপ্রিয় দর্শনীয় স্থান আনাইরাঙ্গাল ড্যাম। মুন্নার থেকে ২২ কিলোমিটার দূরে এই ড্যাম অবস্থিত। এখানে যাওয়ার রাস্তাটি বেশ দৃষ্টিনন্দন। সড়ক পথে যেতে দুপাশে চোখে পড়বে খাড়া পাহাড় আর পাহাড়ের কোলে ছবির মতো সুন্দর কিছু গ্রাম। এই রাস্তা মাদুরাইয়ের দিকে চলে গেছে। এর মাঝে রয়েছে একটি ভিউ পয়েন্ট।

একদিকে পাহাড়, অন্যদিকে অতল খাদ। মাদুরাইয়ের থেকে একটু এগোলেই পড়বে আনাইরাঙ্গাল ড্যাম। ঘন জঙ্গল আর মাঝখানে এই ড্যাম এক অসম্ভব সুন্দর ল্যান্ডস্কেপ তৈরি করে রেখেছে। কফি, চা, এলাচ বাগানে ঘেরা আনাইরাঙ্গাল একটি পিকনিক স্পটও। পাহাড়ের পাদদেশে ছোট ছোট গ্রাম্য রেস্তোরাঁয় বসে চা-কফির স্বাদ একবার চেখে না দেখলে জীবন অসম্পূর্ণই থেকে যাবে।

মাত্তুপেট্টি

শহর থেকে ৮ কিলোমিটার দূরে মাত্তুপেট্টি ড্যামটি অবস্থিত। কুণ্ডলা, মুদ্রাপূজা ও নাল্লাথনি নদীর সংযোগ এই লেক। মাত্তুপেট্টি ড্যাম ও লেক পর্যটকদের কাছে এক আকর্ষণীয় পর্যটন স্থান। পাহাড় ঘেরা হ্রদের মনোরম দৃশ্য উপভোগ করার জন্য লেকের শান্ত জলে নিরিবিলি পরিবেশে বোটিং করা পর্যটকদের কাছে এক অনন্য অভিজ্ঞতা। লাগোয়া অরণ্য থেকে মাঝেমধ্যে বেরিয়ে আসে হাতির দল।

গডস ওউন কান্ট্রি’ বলা হয়ে ভারতের কেরালাকে। তবে এর নেপথ্যে মুন্নার-এর বিশেষ অবদান রয়েছে। এখানকার মুন্নার এর চা বাগানে ঘেরা পরিবেশে কয়েকদিন কাটালেই মন ভালো হয়ে যাবে সন্দেহ নেই। এর আবহাওয়াও বেশ বৈচিত্র্যপূর্ণ। ভোরে তীব্র ঠাণ্ডা, আবার দুপুরে কখনো রোদ, কখনো মেঘ। বিকেলে আবার হঠাৎই বৃষ্টি। আবার বৃষ্টি থামতেই মেঘের আড়াল থেকে উঁকি দেয় চাঁদের মায়াবী আলো।

ভ্রমণের সেরা সময়

স্থানীয়দের মতে, বর্ষাকালে মুন্নারের প্রকৃতি সবচেয়ে সুন্দর।

কীভাবে যাবেন

মুন্নার যেতে হলে বাস ধরতে পারবেন ভারতের বেশির ভাগ রাজ্য থেকে। কচি শহর থেকে মুন্নার ১৫০ কিলোমিটার দূরে, যেতে পারবেন রেলে। এরনাকুলাম বা আলুভা স্টেশানে নেমে, সেখান থেকে গাড়ি নিয়ে মুন্নার।

কোথায় থাকবেন

মুন্নারে থাকার জন্য অবশ্যই আপনাকে বেছে নিতে হবে কোনো চা বাগানের রিসোর্ট। তালায়ের ভ্যালী বাংলো কিংবা লকহার্ট টি ফ্যাক্টরিতে আছে কিছু অসাধারণ সুন্দর রিসোর্ট। মাথার উপর ঝাড়বাতি, ভিক্টোরিয়ান আসবাবপত্র, সুবিশাল ফায়ার প্লেস এবং হীরকে মোড়ানো আয়ানার দেখা পাবেন এসব লাক্সারি রিসোর্টে। রেস্তোরাঁয় পাবেন তাজা চা এবং খাওয়াদাওয়া করে বেরিয়ে পড়ার জন্য গাড়িও প্রস্তুত থাকে এসব রিসোর্টে।

বাংলোগুলো প্রায় ২,৫০০ একর আয়তনের চা বাগানের মাঝখানে অবস্থিত। গহীন বনের মাঝে থাকার অভিজ্ঞতা পাবেন। ভুমি থেকে মুন্নারের উচ্চতা কম নয়। রাত পেরোতেই দেখবেন রুমের ভিতরে মেঘ এসে খেলা করছে। চায়ের কাপ হাতে নিয়ে সানরাইজ দেখতে ভুলবেন না।

বি: দ্র : ঘুরতে গিয়ে দয়া করে পরিবেশ নষ্ট করবেন না,চিপস এর প্যাকেট, পানির বোতল এবং অপচনশীল দ্রব্য নির্ধারিত স্হানে ফেলুন।। এই পৃথিবী, আমার, আপনার সুতরাং নিজের দেশ এবং পৃথিবীকে সুন্দর রাখা এবং রক্ষনাবেক্ষনের দায়িত্বও আমার এবং আপনার হ্যাপি_ট্রাভেলিং

ভ্রমণ বিষয়ক তথ্য পেতে জয়েন করুন আমাদের ফেইসবুক গ্রুপ এবং ফলো করুন আমাদের পেইজ